ধারা বহমান
১৭ নভেম্বর, ২০১৬ ১৯:১৯
প্রিন্টঅ-অ+
নাহিদা আশরাফী
-টাকাটা কবে পাঠাতে পারবি?
-আজ তো বৃহস্পতিবার। এখন তো ব্যাংক বন্ধ হয়ে গেছে। সকালে বললেও পাঠাতে পারতাম। এরপর শুক্রবার আর শনিবার। চাইলেও পাঠাতে পারবো না। রবিবারে জমা দিয়ে দেই?
-আচ্ছা। এর বেশি দেরি করিস না।
-আমি তো দেরি করিনি। এ মাসেই তো টাকাটা ফেরত দেবার কথা। নয় কি?
-হুম।
-তো দেরি বললি কেন? আমি বিপদে পড়েই টাকাটা ধার নিয়েছিলাম। নেবার সময়ই বলেছিলাম জুলাই মাসে দেবো। আমি আমার কথার অন্যথা করিনি, করবোও না। বরং তুই করেছিস। কি কথা ছিল তোর সাথে? ইমার্জেন্সি লাগলে এক সপ্তাহ সময় দিয়ে চাইবি। বলেছিলাম না তোকে? তুই কি তা দিয়েছিস?  ধুম করে বললি আজ টাকাটা দে।
-আচ্ছা আচ্ছা এত প্যাঁচানোর দরকার নেই। তুই রবিবারই ব্যাংকে জমা করে দিস।
-আমি প্যাঁচাইনি শুভ্র। ওকে রবিবারই টাকাটা পেয়ে যাবি। ভালো থাক।
শুভ্রকে আর কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়েই কট করে লাইনটা কেটে দিলো ধারা। না দিয়ে উপায়ও ছিল না। এর বেশি কথা বাড়ালে ও নিশ্চিত নিজেকে সামলাতে পারতো না। এরই মধ্যে টপটপ করে কয়েক ফোঁটা জল গড়িয়ে ওর কোলের কাছে শাড়িটা ভিজিয়ে দিয়েছে। 
দিনটা আজ শুরু থেকেই রাতের আঁধার কোলে নিয়ে বসে আছে। চাকরিটা হয়েও হলো না। দিনের শুরুতেই টানা সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা খেয়ে ফেললো ইন্টারভিউটা। খেয়েও যদি সন্তুষ্ট হতো আপত্তি ছিল না ধারার। কই উল্টো ভাবখানা এই- মাত্র সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা, চারখানা সার্টিফিকেট  হোক তা সব প্রথম শ্রেণির আর তিন বছরের অভিজ্ঞতা দিয়েই ভেবেছো আমাদের সন্তুষ্ট করতে পারবে? এত সহজ!  ফিজিক্সে ফার্স্ট ক্লাস পেলেই হলো। কত সহজ প্রশ্নের আর একটা ছোট্ট এসএমএস-এর উত্তর দিতে পারলে না। ছানা দুহাত দিয়ে চটকালে বেশি মসৃণ হয়, না এক হাতে চটকালে? সানি লিওন আর বিপাসা বসু, কে বেশি উত্তেজক? এই সব সাধারণ প্রশ্নের উত্তর জানো না। না জানলেও চলতো। অই যে এসএমএস তোমার মোবাইলে, ‘আজ রাতে... চলবে? তাহলে কাজ কনফার্ম।’  তুমি একটু ওকে লিখলেই সব সেট হয়ে যেত। চাকরি, নিশ্চিন্ত জীবন। মাকে রোজ অফিসে যাই বলে মিথ্যে বলা লাগতো না, বাড়ি ছাড়ার নোটিশ পেতে হতো না, মুদি দোকানদার আগের দেনা না মেটালে নতুন করে সওদা দেবে না বলে শাসাত না। আর তোমার নিজের ইচ্ছে, চাহিদা এসব না হয় নাই বললাম। ধুর মেয়ে তুমি কিচ্ছু পারো না। কিচ্ছু না। আর পেরেছো তুমি।
অমন উ™£ান্ত আর ছন্নছাড়া সময়টাতে শুভ্রর ফোন ওর ভাবনাকে কিছুটা হলেও অন্য রাস্তায় নেবে এমনটিই ধরে নিয়েছিল ধারা। সে রাস্তা মসৃণ, অমসৃণ, পিচঢালা, মেঠো যাই হোক এই অসহ্য সময়টা থেকে পালাতেই শুভ্রর ফোনটা ধরলো। কিন্তু ব্যাপারটা যে এমন হবে কে ভেবেছিল? ছোটবেলার বাগধারার সার্থক রূপায়ন বড় বেলার ধারাকে এমন দিখ-িত করছে যে ও পালাবার পথও পাচ্ছে না। বিপদ কি সত্যিই কখনো একা আসে না?  যে অস্থির মুহূর্ত থেকে পালাতে সে শুভ্রর ফোন ধরলো, সেই মুহূর্তটাই যেন সিন্দাবাদের ভূঁতের মতন ওকে আরও চেপে ধরলো। ধারার মাথায় আসছে না শুভ্র এমন কেন করলো। তবে কি নীরার কথাই ঠিক? শুভ্রকে দুদিন নীরা যে মেয়েটির সাথে দেখেছে মেয়েটি নাকি দারুণ সুন্দরী। ধারা মানতে চায়নি। গত কয়েক মাস শুভ্রর পরিবর্তন ওর চোখে লেগেছে কিন্তু অফিসে ওর দ্রুত প্রমোশনে মনকে স্বান্তনা দিয়েছে। নিজেকে যোগ্য প্রমাণ না করতে পারলে কি আর প্রমোশনটা পেয়েছে? তবু মনের ভেতরের খচখচানি ভাবটা দূর করতেই একদিন শুভ্রকে আকার ইঙ্গিতে কিছু একটা বোঝানোর চেষ্টা করেছিল। কিন্তু শুভ্র হঠাৎই ওদের বিয়ের প্রসঙ্গ টেনে আনায় ধারা নিজেই নিজের সংকীর্ণতায় লজ্জা পেলো। ছি! ছি! ধারা তুমি নিজেই দেখো তুমি কত ছোট মনের। তুমি শুভ্রকে নিয়ে কি ভাবছো  আর শুভ্র তোমাকে নিয়ে কি ভাবছে। নিজেকেই নিজে শাসিয়েছে অনেক। অথচ শুভ্রর আজকের আচরণ তো নীরার কথাকেই সমর্থন দিচ্ছে। তবে কি সেদিন কথার প্রসঙ্গ পাল্টে দিতেই শুভ্র...
 
অনেকটা হঠাৎ করেই নীরার বিয়েটা ঠিক হলো। নীরার পূর্ব পরিচিত। যদিও লেখাপড়ায়  তেমন এগোতে পারেনি ছেলেটা, তবু দেখতে ভালো, টাকা-পয়সাও বেশ আছে। এসব দেখে ধারাও আর আপত্তি করেনি। নিম্ন মধ্যবিত্ত সংসারের সন্তানরা যে অনুপাতে শারীরিকভাবে বাড়ে সেই অনুপাতের অনেক বেশি অনুপাতে বেড়ে ওঠে তাদের মনের হাহাকার,ক্ষুধা,অভাব আর দারিদ্র্য। এসব অপশক্তি দূরে ছুড়ে ফেলার জন্যে যে মনের জোর দরকার খুব কম ছেলেমেয়েই তা জোগাড় করতে পারে। ভালো-মন্দবোধ, জাগতিক জ্ঞান, যৌক্তিকতা এসব খুব গৌণ হয়ে পড়ে তখন। নীরাকে নিয়ে এই ভয়টা সবসময়ই ছিল ধারার। খুব বেশি মাত্রায় আবেগী মেয়েটা। যুক্তি দিয়ে বিচার করার ক্ষমতা সবার সমান নয়। ধারা কোনো কাজ করতে যেমন দশবার ভাবে নীরা তার উল্টো। কোনো কিছু না ভেবেই ধুম করে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। তাই ছেলেটির কথা যখন নীরা ওকে জানালো, ধারা খুব দ্রুতই খোঁজখবর নেবার চেষ্টা করলো। খোঁজ নিতে গিয়েই জানলো ছেলেটি ওদের চাচাতো বোনের দেবর। পরিবারের গ-ির মধ্যে হওয়ায় দুপক্ষই আর দেরি করতে চাইলো না। তাছাড়া ছেলের তাড়াও অনেক। বিয়ে করে বৌ নিয়ে ইটালি পাড়ি দেবে।
এত ঝটপট বিয়ের তারিখ পড়ে যাওয়ায় অথৈজলে পড়লো ধারা। কিছু না হলেও তো এক লাখ টাকার ধাক্কা। পাত্রকে অবশ্য সরাসরিই জানিয়েছিল ধারা তার অর্থনৈতিক দৈন্যদশার কথা। এই মুহূর্তে কোনো আনুষ্ঠানিকতা একেবারেই অসম্ভব। খুব পারিবারিকভাবেই মাত্র জনা তিরিশেক আত্মীয়, বন্ধুদের উপস্থিতিতে নীরার বিয়ের কাজটা সেরে ফেলতে হলো। আসলে বলা যতটা সহজ কাজটি কি অত সহজে হয়েছে? কাজের সহযোগী যাও বা দু’একজন পাওয়া যায় আর্থিক সহযোগী পাওয়া অসম্ভব ব্যাপার। আঠারোতম জন্মদিনে যে চেইনটা পেয়েছিল বাবার কাছ থেকে, শেষ স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে খুব যতœ করে রেখে দিয়েছিল সেটি। মাঝে মাঝে নেড়েচেড়ে দেখতো। হাতে নিলে কেমন যেন বাবার ছোঁয়া পেত।  শেষে কোনো এক জঙ ধরা বিকেলে উপায়হীন হয়ে দু’ভরি ওজনের চেইনটা সুশান্ত  বাবুর কাছে দিয়ে এলো। তাতে হাজার পঞ্চাশেক হলো বটে; কিন্তু তারপরও আরো পঞ্চাশের ধাক্কা ছিল। মাকে বলে কোনো লাভ নেই। ম্যানেজ ওকেই করতে হবে। লাজলজ্জার মাথা খেয়ে শেষে শুভ্রকে বলেছিল ধারা। এই এগারো বছরের সম্পর্কে ও কোনোদিন কিছু চায়নি শুভ্রর কাছে। চাকরি নেই, না খেয়ে থেকেছে। তবু শুভ্রর সামনে প্রকাশ করেনি। কিন্তু এবার আর উপায় ছিল না। শুভ্র টাকাটা দিয়েছিল ওকে। শুধু তাই নয় খুব আনন্দের সাথেই দিয়েছিল। টাকাটা পেয়ে ধারা হাঁপ ছেড়ে বাঁচল। উল্টো সুশান্ত বাবুকে কেন চেইনটা বন্ধক দিলো এ নিয়ে বেশখানিকটা রাগও দেখালো ধারার সাথে। 
তিন মাস হলো নীরা ওর শ্বশুরবাড়িতে। মাঝে মাঝে এসে মাকে দেখে যায়। মায়ের জন্যে আপেল, হরলিক্স কত কি নিয়ে আসে। শুক্রবার বিকেলটা ধারা নিজের মতন কাটাতে চেষ্টা করে। আজ আর তা হলো না। নীরা এসেই শুনশান বিকেলের নীরবতা নাড়িয়ে দিলো। মায়ের সঙ্গে বেশ জমিয়ে গল্পজুড়ে দিলো। শ্বশুর-শাশুড়ি কত আদর করে, হানিমুনে ইউরোপের কোনো না কোনো দেশে যাবে, এক মাসের মধ্যে ওরও ভিসা হয়ে যাবে আরও কত কি। যাবার সময় মায়ের সাথে আর ধারার সাথে সেলফিও তুললো নতুন স্মার্ট ফোন দিয়ে। বন্ধুদের নিয়ে কেএফসিতে গেটটুগেদারের ছবি দেখাতেও ভুললো না। ধারা ভীষণ রকম খুশি হবার দারুণ অভিনয় করলো। অভিনয়ই তো। নইলে যে নীরা কষ্ট পেতো। নীরা যখন কথা বলছিল ধারা লুকিয়ে লুকিয়ে ওর চোখ দেখছিল। অনেক কষ্টেও সেই চোখে মা বা ওর জন্যে কোনো ভালোবাসার ছায়া খুঁজে পেলো না। ওকে দেখলে মনেই হয় না মাত্র তিনমাস আগেই ও এই দুটি মানুষের সাথে জীবনকে যাপন করেছে। ধারা দ্বন্দ্বে পরে গেল। আসলে নীরার যাপিত জীবন কোনটা? ওদের সাথে এক রুমে কায়ক্লেশে কাটিয়ে দেয়া নিম্ন মধ্যবিত্তের রংচটা জীবনটা, নাকি বিত্তবৈভবের  র?্যাপিংয়ে মোড়ানো চকচকে উচ্চবিত্তের জীবনটা? 
-একটু মুটিয়ে গেছিস রে নীরা। নিজের দিকে যতœ নিস।
-ইস দি। তুমি বললে। ও তো আমাকে স্কাইপে-তে দেখে আঁতকে উঠেছে। কি বলে জানো, ‘মাত্র এক মাস আগে তোমায় রেখে ইটালি এলাম। আর এর মধ্যেই এই অবস্থা?  সোনা প্লিজ জিমে যাও। আজই গিয়ে ভর্তি হয়ে আসো।’  জিমে গিয়ে খোঁজ নিয়ে তো আমার চোখ ছানাবড়া। তিন মাসের কোর্স ফি পঁচাত্তর হাজার টাকা। কান ইউ বিলিভ ইট?
ধারা হাসে। ইদানীং কথায় কথায় বেশ ইংরেজি বলার চেষ্টা করে নীরা। বলতে গিয়ে ঠোঁট এতটা বাঁকায় যে দেখতে খুব অদ্ভুত লাগে। ধারা একবার ভাবলো নীরা কে বলবে। কিন্তু পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিলো। থাক মধ্যবিত্তের বলয় থেকে বেরিয়ে আসবার এও এক বিচিত্র চেষ্টা বটে। 
-ভর্তি হয়েছিস?
-হ্যাঁ দি। না হয়ে উপায় আছে? ইটালি যাবার আগে যে করেই হোক স্লিম হতে হবে। নইলে ওর বন্ধুদের সামনে ও কতটা ছোট হয়ে যাবে বুঝতে পারছো?
-হুম।
-জানো দি, গতকাল না আমার শাম্মা আমার জন্যে আড়ং থেকে এই শাড়িটা এনেছেন। বলতো কত নিলো?
-শাম্মা!
-ওহ দি। তুমি না এখনও ব্যাকডেটেড রয়ে গেলে। শাম্মা মানে শাশুড়ি মা। সংক্ষেপে শাম্মা।
-ওহ।
-বলো না।
-কি?
-কত নিলো শাড়িটা?
-আমি কি করে জানবো বল।
-তবু আন্দাজ করো না।
-দশ হাজার।
-ও মাই গড! দি তুমি আমাকে বলেছো ঠিক আছে। আই এম সো লাকি যে তুমি আমার শ্বশুর বাড়ির কারো সামনে বলোনি।
-কেন রে? বেশি বলে ফেলেছি?
-ইউ নো এই শাড়িটার দাম বাইশ হাজার টাকা। আর তুমি কিনা বলছো দশ হাজার। উফ। তুমি না।
এর পর আরও কি কি যেন বলছিল নীরা। ধারা তখন অন্য জগতে। একটা শাড়ি বাইশ হাজার। এমন দুটো শাড়ির দাম অথবা দুমাসের জিমের ফি পেলে তো ও শুভ্রর টাকাটা পরশু অনায়াসে দিয়ে দিতে পারতো। কাল-একদিনের মধ্যে কেমন করে কোথা থেকে টাকাটা জোগাড় করবে ওর মাথায় আসছে না। ধারা শুধু জানে যেমন করেই হোক শুভ্রকে টাকাটা ফেরত দিতে হবে। কোনোভাবেই ও শুভ্রর কাছে ছোট হবে না।
অস্থিরতা কষ্টের বটে তার চেয়ে বড় কষ্ট সেই অস্থিরতা ধামাচাপা দিয়ে স্বাভাবিকতার অভিনয় করা। এর মধ্যে তিনবার মা জানতে চেয়েছেন কিছু হয়েছে কিনা, চোখমুখ শুকিয়ে আছে কেন এত। কি বলবে ধারা। বলে লাভ কি? অহেতুক একটা অসুস্থ মানুষকে আরও অসুস্থ করে তোলা। মায়ের চোখ এড়াতেই পুরনো ট্রাঙ্কটা খুলে বসলো ধারা। ও জানে এখানে কিছুই নেই যা ওকে পঞ্চাশ হাজার টাকার ব্যবস্থা করে দিতে পারে। তবু নিজেকে ব্যস্ত রাখার এ এক ক্ষুদ্র আয়োজন। একটা বেশ পুরনো নীলফুল তোলা ফ্রক, দুটো নকশা তোলা কাঁথা, এক জোড়া ঘুঙুর। হাতে নিতেই বুকের ভেতর বেজে উঠলো নূপুর জোড়া। আঠারো বছর পার হয়েছে কিন্তু স্মৃতিগুচ্ছ এখনও মনে হয় বারান্দার  টবে রাখা মানি প্লান্টের মতোই তরতাজা। বাবার হাত ধরে প্রথম যেদিন শৈলেন কাকার নাচের ক্লাসে যায়, ধারা রীতিমতো ভয়ে গুটিসুটি মেরে ছিল। অবশ্য ধারা কেন, কাকুকে দেখলে ভয় পেত না এমন কেউ কি ছিল পাড়ায়? ইয়া লম্বা, একহারা গড়ন, পেটানো স্বাস্থ্য। রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাবার সময় মনে হতো কোনো এক পাহাড় তার অবিচল ভাবগাম্ভীর্য নিয়ে চলছে। মুক্তিযুদ্ধকালীন একটি অগ্রগামী গ্রুপের প্রধান ছিলেন শৈলেন কাকু। গ্রুপের কোড নেম ছিল ধলা পাহাড়। কাকু অই গ্রুপের প্রধান ছিলেন। তাকে দেখেই নামটা রাখা হয়েছিল। বাবার কাছে এসব গল্প কম শোনেনি ধারা। যুদ্ধ শেষে নিজবাড়িতে ফিরে ধর্ষিত বউ ছাড়া আর কাউকেই পাননি। তবু মনোবল হারাননি, দেশ ছেড়েও যাননি। অসুস্থ বউকে নিয়েই নতুন জীবন শুরু করেন। নিজবাড়িতে নাচের স্কুল করেন। যে যা দিয়েছে তাই নিয়েছেন। অনেককে নাকি বিনে পয়সায়ও নাচ শিখিয়েছেন। সব প্রতিবন্ধকতা জয় করে ঠিক যখন গুছিয়ে উঠেছেন তখনি কাকিমা এক যুদ্ধশিশুর জন্ম দিতে  গিয়ে চলে গেলেন না ফেরার দেশে। কাকাবাবুর জীবনে আর এক নতুন যুদ্ধ শুরু হলো। সামাজিক সব কূটতর্ককে আবর্জনার স্তূপে ফেলে সেই যুদ্ধ শশুকে নিজ সন্তান হিসেবে বড় করে তুলতে তার প্রচেষ্টার কিছুমাত্র কমতি ছিল না। ছেলে সুশান্তও  বাবার চেষ্টাকে বৃথা যেতে দেয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়েছে। বাবার ভঙ্গুর, মৃতপ্রায় পুরনো ব্যবসার হাল ধরে তাকে নতুন জীবন দিয়েছে। তীক্ষè ব্যবসায়িক বুদ্ধি আর অমায়িক আচরণকে পুঁজি করে সুশান্ত  গড়ে তুলেছে তার বিশাল ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য। সাথে বাবার ছোট্ট নাচের স্কুলকে এখন এমন অবস্থানে দাঁড় করিয়েছে দেখলে অবাকই হতে হয়। চোখের সামনে এই পরবর্তন দেখেছে ধারা। শৈলেন বাবু অবশ্য অনেকটাই দেখে গেছেন। ওপার থেকে এখনও নিশ্চয়ই দেখছেন।
সেই শৈলেন বাবু  আর ধারার বাবার বন্ধুত্ব ছিল দেখার মতন। শুক্রবার আসরের আজানের আগেই মসজিদের ছোট্ট বারান্দায় এসে বসতেন কাকাবাবু। বাবা নামাজ পরে বের হলে দুজন একসাথে ঘুরতে বেরোতেন। শুক্রবার বিকেলটা ছিল ওদের দুজনের। একবার ধারার বাবা গাজীপুর গেলেন অফিসের কি কাজে। আর বাবা দূর থেকে ফেরা মানেই দুবোনের বাড়তি আনন্দ। বাবার ব্যাগ মানেই জাদুর বাক্স। কত কি নিয়ে আসতেন মেয়েদের জন্যে। অথচ সেবার গাজীপুর থেকে ফিরে বাবা কিছুতেই ওদের হাতে ব্যাগ দিতে নারাজ। একটা দিলেন বটে আর একটা কিছুতেই হাতছাড়া তো করলেনই না উল্টো মুখ গম্ভীর করে ঘোষণা দিলেন  যেন কেউ এই ব্যাগে হাত না দেয়। নিষিদ্ধ বস্তুর আকর্ষণ ছেড়ে দুবোনের কেউই দূরে থাকতে পারল না। কিন্তু ব্যাগ খুলে দেখবো এমন সাহসও ঠিক সঞ্চয় করতে পারল না। বিকেলে শৈলেন কাকু এলেন। বাবা খুব সাবধানে ব্যাগটা আলমারির ওপর থেকে নামিয়ে আনলেন। দুবোন এমনকি মাও এসে দাঁড়ালেন পাশে। বাবা একটা পুঁটলি বের করে কোলের ওপর রাখলেন। বাবার গায়ের চাদর দিয়ে খুব সাবধানে প্যাঁচানো মোড়ক খুলতেই বেরিয়ে এলো মাটির তৈরি রাধাকৃষ্ণ আর গণেশের দুটি মূর্তি। আহা! কি সুন্দর। কাকাবাবু মিটিমিটি হাসছেন। ধারা আর নীরা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। খুব শখের এই কাশ্মিরি চাদর বাবা কাউকে ধরতে পর্যন্ত দেন না। আর সেই চাদরে বাবা কত আদরে রাধাকৃষ্ণ আর গণেশ মূর্তি জড়িয়ে এনেছেন কাকার জন্যে। কাকাবাবুর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বাবার আনা এই দেবতাদ্বয়ের মূর্তিই কাকাবাবুর পূজোর আসনে বসানো ছিল। সেই কাকাবাবুর কাছে প্রতি শনি আর রবি দুদিন বিকেলে গিয়ে ধারা নাচ শিখতো। বেশ ক’বছর শিখেছিল। কাকাবাবুর মৃত্যুর পর ধারা আর যায়নি।  কাকাবাবু চলে যাবার ঠিক দুবছরের মাথায় বাবাও চলে গেলেন। এরপর সবই অন্যরকম সংগ্রামের ইতিহাস। জীবন ওকে এমন নাচিয়েই ছাড়লো যে এই নাচের কথা ধারা মনেই আনতে পারতো না।
হঠাৎ কি মনে করে ধারা ট্রাংকটার একোণ ওকোণ খুব উৎকণ্ঠা নিয়ে খুঁজতে শুরু করলো। খুঁজতে খুঁজতে পেয়েও গেল। এত কিছুর মীমাংসা হলেও আজ অবধি ধারার জানা হয়নি সেই পনেরোটি গোলাপি চিঠির রহস্য। এমনকি ধারা আজ অবধি স্পষ্ট না চিঠিগুলো তাকেই পাঠানো নাকি অন্য কাউকে। কোনো প্রাপকের নাম নেই, নেই কোনো প্রেরকের ঠিকানাও। কখনও বাড়িতে ঢোকার পথে ভাঙা দেয়ালের ওপরে, কখনও বাড়ির ছাদে, কখনও বড় শিউলি গাছের নিচে ঝরা শিউলির ওপরে আরও কত কত জায়গায়। গুনে গুনে এমন পনেরোটি চিঠি পেয়েছিল ধারা। সদ্য কৈশোর পেরোনো সময়টাতে এই চিঠিগুলোই তাকে প্রেম, ভালোবাসা আবার একইসাথে প্রথম বিরহের মতন সূক্ষè অনুভূতির সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। প্রথমটায় চিঠিগুলো ওর মধ্যে এমন কোনো আগ্রহ তৈরি করতো না। পড়তে বেশ লাগতো।  কিন্তু অন্যের চিঠি ভেবে কি এক অপরাধবোধ কাজ করতো। ভাবতো কার না কার চিঠি। কিন্তু ক’দিন যেতে না যেতেই ওর ভেতরে এক অপেক্ষা আর আগ্রহের পাখি ডানা ঝাপটাতে শুরু করে। সকালে ঘুম ভাঙতেই অথবা স্কুল থেকে ফেরার পথে নয়তো নাচের ক্লাস শেষে ধারার চোখ কিছু একটা খুঁজে ফিরতো। কতদিন চিঠির অপেক্ষায় লুকিয়ে  কেঁদেছে। অজানা প্রেমিকের প্রতি অকারণ অভিমান ওকে নিপুণভাবে বিদ্ধ করেছে। কতদিন লুকিয়ে রাখা চিঠিগুলো বের করে আপনমনেই কথা বলেছে। সেই পরিপূর্ণ আবেগ আর কখনই খুঁজে পায়নি ধারা। শুভ্র ওর জীবনের সবটা জুড়ে থাকলেও এই পনেরোটি চিঠি ওর হৃদয়ে এক অনাবিষ্কৃত মহাসাগরের তলদেশের মতোই রয়ে গেছে। শুভ্র সেখানে কখনই পৌঁছতে পারেনি। এরপর হঠাৎ করেই চিঠি আসা বন্ধ হলো। মায়ের ডাকে আচমকাই বর্তমানে ফিরতে হলো ধারার। মায়ের ওষুুধ দেবার সময় হয়েছে। আর এসব চিঠি কিছু সুখানুভূতিই দিতে পারবে। কিন্তু ধারার যা প্রয়োজন তা কখনই কি দিতে পারবে? ধারা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মায়ের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। সারারাত ধারার ঘুম এলো না। কার কাছে যাবে? কে তাকে পঞ্চাশ হাজার টাকা দেবে? একদিনের মধ্যে এই টাকা সে কেমন করে জোগাড় করবে? অস্থিরতা তাকে এতটাই তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ালো যে একবার আত্মহননের চিন্তাটাও উঁকি দিতে ছাড়লো না। 
 
  ৬ 
নির্ঘুম রাতটা পার হয়ে কখন যে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে ধারা টের পায়নি। পাখির কিচিরমিচিরে বারান্দায় এসে দাঁড়াতেই আশ্বিনের হালকা শীতল বাতাসের ঝাপটা শরীর জুড়িয়ে দিলো। কি মায়া বিছানো চারদিকে। স্বল্প এই সময়টাকে বড্ড আপন আর বড্ড নির্মোহ মনে হয় ধারার। কেমন টুপ করে অনন্তের গহ্বরে  ঝরে পড়ে, যেমন  শিউলি তার জন্মবোটা ছেড়ে খুব দ্রুত ঝরেপড়ে ধরিত্রীর কোলে। খুব আফসোস হয় এত ক্ষণস্থায়ী সময়ের জন্যে। আরও কিছু সময় এই ক্ষণটুকু স্থির হয়ে থাকলে জগৎসংসারে কি খুব ওলটপালট হয়ে যেত? নাহ গ্রিল দেয়া বারান্দাটা এই মুহূর্তে ধারার কাছে খাঁচা মনে হচ্ছে। দরজাটা খুব সাবধানে খুলে শিউলি তলায় ছড়ানো ফুলের কাছাকাছি এসে থমকে দাঁড়ালো ধারা। ও কি দেখছে এসব! একি সত্যি?  নাকি সারারাত না ঘুমানোর প্রতিক্রিয়া? নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না। ধারা এক দৌড়ে ঘরের গ্রিলটার কাছে ছুটে এলো। একটা লম্বা নিঃশ্বাস নিলো। ধারা খুব যুক্তিবাদী মেয়ে। এ রকম হ্যালুসিনেশন তো তার হবার কথা নয়। নিজেকে স্থির করে আবার শিউলি তলার দিকে তাকালো। নাহ সে ভুল দেখেনি। এত বছর পর! ধারা এগোতে গিয়ে দেখে তার পা চলছে না। মনে হচ্ছে দশ কদমের পথ পার হতে তার দশ জনম লেগে যাবে। অনেক কষ্টে নিজেকে টেনেহিঁচড়ে শিউলিতলায় দাঁড় করালো। কাঁপা হাতে খামটা তুলে নিল। বুকের ভেতর দূরবর্তী কারখানার ঘণ্টাধ্বনির মতো ঢং ঢং বেজেই চলেছে। উত্তেজনায় চিবুকে ঘাম জমেছে এই হালকা শীতল আবেশেও। সেই গোলাপি খাম। এত বছরে এতটুকু বদলায়নি। খামটা খুলতে গিয়ে আঙ্গুলগুলো কেমন লজ্জায় ভয়ে একে অপরের সাথে পেঁচিয়ে যাচ্ছে। ঠিক আগের মতই। সাত-আট লাইনের চিঠি। সম্বোধন হীন।
‘ঠিক ষোলো বছর তিন মাস সাতদিন পর তোমায় লিখছি। প্রতিজ্ঞা রাখতে গিয়ে আর যাই হোক তোমায় হারাতে পারবো না। তোমায় না পাওয়ার দুঃখবোধ চাপা দিয়েছিলাম দূর থেকে দেখবার আনন্দে। শান্তি না পেলেও স্বস্তি জাগতো এই ভেবে, তোমায় দেখতে তো পাচ্ছি। কিন্তু গত ক’দিনে তোমার দুশ্চিন্তা তোমায় এতটাই গ্রাস করেছে যে তুমি নিজেকে হারাতে বসেছো। আমি তোমাকে চিনি আমার নিজের থেকে বেশি,আর তোমার থেকে আরও বেশি। ভেবো না শুভ্র বাবুর টাকা আগামীকাল ঠিক তার একাউন্টে জমা হয়ে যাবে। নিজের দিকে যতœ নিও। তোমায় না পাই দুঃখ নেই। হারানোর কষ্ট সইবে না। ভালো থেকো সদা। ওহ আর একটা কথা দুপুরের আগে কাউকে পাঠিয়ে কাকাবাবুর দেয়া চেইনটা নিয়ে নিও। ওটা বাবাকে দেয়া কাকাবাবুর শেষ চিহ্ন রাধাকৃষ্ণের গলায় পরিয়ে রেখেছি। ওটা তোমার গলাতেই ভালো মানাবে।’
একটানে চিঠিটা পড়েই ধারা খুব ব্যাকুল হয়ে কাউকে খুঁজতে লাগলো। নাকি সে নিজেকেই খুঁজলো, কে জানে? এই প্রথম আলো-আঁধারের এই সময়টুকু বড্ড দীর্ঘ মনে হলো তার কাছে।

সর্বশেষ সংবাদ

শিল্প ও সাহিত্য এর অারো খবর

Copyright JaiJaiDin ©2020

Design and developed by Orangebd